বই তরণী

বই বিষয়ক ভাবনাচিন্তা, বই নিয়ে আলোচনা

সরস তথ্যের মুদিখানা

চালু করুন মার্চ 4, 2012

বেশিরভাগ বাঙালি পাঠক কলকাতার জোঁড়াসাকো ঠাকুরবাড়ির অদ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথ কিংবা অনবদ্য অবনীন্দ্রনাথের লেখনীর সাথে পরিচিত হলেও, সেই বাড়িরই আরেক প্রতিভাবান সাহিত্যিক ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম তাঁদের কাছে অবশ্য অনেকটা অপরিচিতই বৈকি ।  কোনো চরিতাভিধান বা কোষগ্রন্থের ভেতরেও তাঁর নাম খুব সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই তাঁরই রচিত গদ্যগ্রন্থ ‘মুদীর দোকান’ নিয়ে লিখবার আগে বইপড়ুয়াদের কাছে ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের খানিকটা পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি।

মুদীর দোকান-ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথের থেকে বয়সে নয় বছরের ছোট ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৭০ সালে। তাঁর পিতা রবীন্দ্রনাথের বড় দাদা হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঋতেন্দ্রনাথের আগ্রহের জগৎ ছিল বিচিত্র। সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ছিলো। একদিকে তিনি যেমন আসবাব পত্র পালিশ করার নিয়ম নিয়ে লিখেছেন তেমনই অন্যদিকে খাদ্যদ্রব্য, দেব-দেবীর বাহনসহ বিচিত্র বিষয়েও নিবন্ধ লিখেছেন। নাট্যাভিনয় ছিল তাঁর নেশা, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় রবীন্দ্রনাথের সাথে অভিনয় করেছিলেন। ‘কালমৃগয়া’য় অভিনয় করেছিলেন অন্ধমুনির ভূমিকায়। কবিখ্যাতিও ছিল তাঁর; ‘সপ্তস্বরা’ ও ‘পদ্মরাগ’ নামে দুটি কবিতার বইও বেরিয়েছিল। খুড়তুতো ভাই বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলি সংগ্রহ ও সম্পাদনা তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। তিন বছরের জন্য ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত ‘পুণ্য’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৩৬ সালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুবরণ করেন।
‘মুদীর দোকান’ বইটি সাহিত্যরসিক ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকটি সরস রচনার সংকলন। এর প্রথম সংস্করণ বের হয়  এক শ বছরেরও আগে, ১৯০৯ সালে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, তখনই বইটি বিষয়বৈচিত্র্যে ও লেখার মানে-গুণে পাঠকের দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলো। পরে ১৯৩৭ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। প্রায় বাহাত্তর বছর অপ্রকাশিত থাকার পর ২০০৮ সালে কলকাতার চর্চাপদ প্রকাশন থেকে বের হলো এর তৃতীয় সংস্করণ। আগের দুটি সংস্করণের বারোটি নিবন্ধ ছাড়াও ‘পুণ্য’ পত্রিকায় ১৩০৭ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘পালিশ’ ও ‘জগন্নাথ তীর্থে গুরু নানক ও জগন্নাথের আরতি’ শীর্ষক ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা দুটি রচনা উদ্ধার করে এই সংস্করণে সংযোজন করা হয়েছে। বইটির এই নতুন সংস্করণে সংক্ষিত অথচ বেশ সুলিখিত  ও প্রাসঙ্গিক ভূমিকা লিখেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক প্রতাপকুমার রায়। পাঠকের কাছে বইটি সহজবোধ্য করে তুলবার জন্য ভূমিকাটি সহায়ক হবে।
‘মুদীর দোকান’-এর রচনাগুলোর অভিনবত্ব হলো বিষয় নিবার্চনে ও লেখার স্বতন্ত্র ধরনে। প্রধানত এসব রচনায় খাদ্য  এবং কয়েকটি খাবার পদ নিয়ে আলোচনা করা হলেও এতে আরও নানা বিষয়ের লেখা পাওয়া যাবে। মুদিখানায় যা যা লভ্য সেসব তো বটেই, ‘আইবুড়ভাত ও বউভাত’, ‘দেবনামে অনাদর’, ‘প্রাচীন ভারতের উপমাস্থল গরু’ এ ধরনের বিষয়ের নিবন্ধও এ বইটিতে রয়েছে।

ঋতেন্দ্রনাথ নিজে ছিলেন একজন গবেষণামনস্ক লেখক । তাই ‘মুদীর দোকান’-এর প্রত্যেকটি রচনায় কমবেশি গবেষণার ছাপ পাওয়া যায়। এ বইয়ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় ওরিয়েন্টাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ রাজেন্দ্রচন্দ্র শাস্ত্রী লিখেছেন, সুপণ্ডিত ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অধ্যয়নের ক্ষেত্র ছিলো বিস্তৃত এবং তাঁর ভারতীয় দর্শনে জ্ঞান ছিল অগাধ। তিনি যখন যে বিষয়ে লিখেছেন সেই বিষয়ের ওপর যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে পাঠককে জানিয়েছেন। তাই ‘মুদীর দোকান’ বইটিতে তথ্যের প্রাচুর্য লক্ষ করা যায়। সেইসঙ্গে তথ্যগুলো বেশ কৌতুহলোদ্দীপক, অশ্রুতপূর্ব  ও মজাদার। যেমন : আমরা বাঙালি মাত্রেই প্রতিদিন দুবেলা ভাত খাই কিন্তু ‘চাল’ শব্দটি কিভাবে এসেছে তা কি ভেবে দেখি? আমরা না ভাবলেও, লেখক ‘চাল’ নিবন্ধে জানাচ্ছেন যে, সংস্কৃত ‘চাল’ ধাতু যদিও ‘চাল’ শব্দের মূলে কিন্তু চাল শব্দটি বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পত্তি। ‘চাল’ শব্দের আসলে উৎপত্তি হয়েছে  ‘চালন’ বা ‘চেলে নেওয়া’ শব্দ থেকে(পৃষ্ঠা ৩৪)। কুমিল্লা জেলায় একসময় বেশ কমলা ফলতো বলে তিনি মনে করেন, কুমিল্লা থেকেই কমলা নামটি এসেছে (‘কমলানেবু’/ পৃষ্ঠা ১১৪)। ‘বউভাত’ লোকাচারের লেখককৃত আদিরূপের বর্ণনায় এ বইয়ের সবচেয়ে কৌতূহল উদ্রেককারী ও মজার তথ্য মেলে। ‘নববধূর ছোঁয়া অন্ন বরের আত্মীয়স্বজন কর্তৃক গ্রহণের আচারবিশেষ’ হলো বউভাত, আমরা এমন তথ্য  অভিধানে পাই এবং তা ঠিক বলেই মনে করি। কিন্তু ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈদিক শ্লোক-সূত্র ঘেঁটে এ আচারের আদিকথা তুলে ধরে অভিধানে দেওয়া অর্থের সম্পূর্ণ উল্টো তথ্য দেন। বৈদিকযুগে বউভাত আচারটি ছিল এইরকম : বিয়ের তৃতীয় দিনে বর নিজহাতে ‘ভক্ত’ অর্থাৎ ভাত রান্না করে খেতেন এবং অবশিষ্টাংশ ঐ দিন সবর্প্রথম বধূকে খাওয়াতেন। লেখক অনুমান করেছেন, বর বধূকে ভরণপোষণ বা খাদ্যদানে সমর্থ কিনা এটি যেন তারই পরীক্ষা (‘আইবুড়ভাত ও বউভাত’/পৃষ্ঠা ৪৪)।

বইখানা পড়ে একটা যাপার আমরা বেশ স্পষ্ট করে বুঝতে পারি—লেখক অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ভারতীয় উপমহাদেশ এককালে বহু বিষয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল। পাশ্চাত্য যে বস্তুর নাম হতে আরম্ভ করে আহাররীতি ও আচরণের অনেকটাই ভারতীয় সভ্যতা থেকে ধার করেছিল সে বিষয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ ছিল না। নিজের মত প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি যেসব যুক্তি দেখিয়েছেন সেসব অকাট্য না হলেও পাঠকের কাছে অবশ্যই নতুন মনে হবে। যেমন ‘তামাক ও ধূমপান’ রচনায় তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, তামাকের ব্যবহার প্রথম ভারতবর্ষেই শুরু হয়েছিল, আমেরিকায় নয়। এমনকি ইংরেজি ‘সিগার'(Cigar) শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ঈষীকা’ শব্দ হতে(পৃষ্ঠা ১৩৮)। ইংরেজি  Bread শব্দটি যে  সংস্কৃত ‘ভ্রাষ্ট্র’ শব্দের অপভ্রংশ লেখক তাও অত্যন্ত আগ্রহের সাথে দেখান(‘লুচিতরকারী/পৃষ্ঠা ১২০)। লেখক আরো জানান সংস্কৃত ‘নাগরঙ্গ’ হতে ‘নারঙ্গ’ ও ‘নারাঞ্জ’  এবং পরে ‘ন’ লোপ পেয়ে ইংরেজী ‘অরেঞ্জ'(Orange)  শব্দের সৃষ্টি হয়েছে (‘কমলানেবু’/ পৃষ্ঠা ৭৫)।
লেখকের বৈঠকি মেজাজ ও সরস ভঙ্গি ‘মুদীর দোকান’-কে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। এ কারণে বইটি সাধুভাষায় লেখা হলেও তা মোটেও গুরুগম্ভীর নয়। বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিসহ লোকাচারসংশ্লিষ্ট নানারকম অজানা তথ্য জানতে ও এক’শ বছর আগের বাংলা রচনাসাহিত্যের স্বাদ নিতে বইটি অবশ্যপাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মুদীর দোকান- ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Advertisements

5 responses to “সরস তথ্যের মুদিখানা

  1. নষ্ট কবি বলেছেন:

    চমৎকার তথ্য পড়লাম

  2. আপনার ব্লগ ফলো করে গেলাম। আশা করি নুতন পোস্ট পেলেই জানব।
    ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: