বই তরণী

বই বিষয়ক ভাবনাচিন্তা, বই নিয়ে আলোচনা

কেশের আড়ে পাহাড় , শাহাদুজ্জামান, পিংক ফ্লয়েড ও আমি

এইসময়ে, যখন বিবরে সূর্যাস্ত নেমে আসে, আমি শাহাদুজ্জামানের গল্পগুলো আবার পড়তে চাইবো। আর তাঁর প্রথম দুটি গল্পগ্রন্থ কেন আমার সংগ্রহে নেই সেই কথা মনে করে রাগ হবে। অতঃপর তাঁর নতুন ও তৃতীয় গল্পগ্রন্থ কেশের আড়ে পাহাড় পড়তে শুরু করি। মনে মনে লালনের ভাবাতুর পদাবলি আউরাই…”চক্ষু অন্ধ দেলের ধোঁকায়, যেমন কেশের আড়ে পাহাড় লুকায়”…


শাহাদুজ্জামানের কাজটাও লালন সাঁইজ্বির ওই পদ বা গানটার মতোন । আমাদের নিত্যদিনের কেশের আড়ালে অনেক ঘটনা ও কর্মের পাহাড়ই লুকিয়ে থাকছে, তাঁর কাজই ওই পাহাড়কে খুঁজে বের করা। নিত্যদিনের পাথর সরিয়ে, জীবনদর্শনের প্রকৃত খনিজ খুঁজে আনার ব্যাপারে তাঁর যে সীমহীন ক্ষমতা(অবশ্য সে ক্ষমতার ওপর সুবিচার তিনি ঃতে দুঃখ কিম্বা ক্রাচের কর্ণেলে করেন নাই, পড়ার পর এ আমার মত।) রয়েছে!

ওঁর গল্পের ভেতর দিয়ে আমরা তাই শেষ অবধি লালনের কথাগুলোকে চারপাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখি, পড়তে গিয়ে কখনো বন্ধুর নোটবুকে পেয়ে যাই অন্ধ শাজাহানের হদিশ, ওদিকে দেখি, আমাদের বুকসেলফে বাঘ। তারপর যেতে যেতে লেখকের সাথে মহাশূন্যে সাইকেল চালাচ্ছি যখন, সেই মুহূর্তেই দেখি, আমার দিকে শাহাদুজ্জামানের লেখা ফেলা বড়গল্পের আসলি মোরগটা তাকিয়ে, মৌন, সেও বিভ্রান্ত, সাথে আমিও…খালি মনে পড়ে…টেবিল টেনিস, মাজার , মক্কিপুর, আসলি মোরগ…আসলি মোরগ! মাঝখানে স্রেফ ঘাসের ওপর সবুজ বাতাস এসে পিংক ফ্লয়েডের সাইকেডেলিক সুর গুনগুন করে যায় আনমনে :

”Plumes of smoke rise and merge into the leaden sky:
A man lies and dreams of green fields and rivers,
But awakes to a morning with no reason for waking

He’s haunted by the memory of a lost paradise
In his youth or a dream, he can’t be precise
He’s chained forever to a world that’s departed
It’s not enough, it’s not enough

His blood has frozen & curdled with fright
His knees have trembled & given way in the night
His hand has weakened at the moment of truth
His step has faltered

One world, one soul
Time pass, the river rolls”
(সংগীতের সাথে সাহিত্যের বিশেষ যোগাযোগ আছে বলে মনে করি)

কেশের আড়ে পাহাড়-শাহাদুজ্জামান

মন্তব্য দিন »

পিয়াস মজিদের ‘করুণ মাল্যবান ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ : স্বতন্ত্র গদ্যে বাঙ্ময় ব্যপ্তির দিশা

সংক্ষিপ্ত, সারবান ও সংবেদী- এই তিনটি চাবি-শব্দ দিয়ে কবি পিয়াস মজিদের ব্যতিক্রমী ও প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ করুণ মাল্যবান ও অন্যান্য প্রবন্ধ-এর বৈশিষ্ট্যগুলোকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে এ বইয়ের প্রবন্ধগুলো ক্ষীণতনু তবে নিটোল। কিন্তু তার মানে এ নয় যে বলবার কথাটি তিনি পুরোপুরি বলতে পারেননি। নির্যাস তো সবসময় পরিমাণে অল্পই হয়। আর তা যদি হয় সুধাসম তো কথাই নেই; অনেককাল তার স্বাদ লেগে রইবে রসনায়।

চিরঞ্জীব বটবৃক্ষতুল্য রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে কালো অক্ষরের ফুল ফোটানো কবি আলতাফ হোসেন পর্যন্ত কালোত্তীর্ণ শব্দসাধকদের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য নিরূপণ আর সাহিত্যরস আস্বাদনে পিয়াস মজিদ পূর্বসূরি সমালোচকের থেকে একেবারেই আলাদা। বড়মাপের সব কবি-সাহিত্যিকদের মূল্যায়নে অযথা নিঃসার বাগবিস্তার না করে লেখক বিন্দু থেকে সমগ্রে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। এ সমগ্রতাকে অনুধাবন করবার জন্যে,পাঠককে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। গ্রন্থে আলোচ্য সাহিত্যকারদের লেখকসত্তার উন্মোচনে পিয়াস মজিদ স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত এক মৌলিক চিন্তাবৃত্তে বিচরণশীল এবং তা বেশ অতলস্পর্শীও বৈকি ।

যেমন সচরাচর কেউ রবীন্দ্রনাথকে পাগল বলে অভিহিত না করলেও পিয়াসের চোখে তিনি এক ‘একলা পাগল’ কিংবা ‘ঐন্দ্রজালিক উন্মাদ’। আর সে পাগলামি এক ব্যতিক্রমী প্রাঞ্জল কথামালায় চিত্রায়িত:

‘আমার আঁধার রাতের সে একলা পাগল। পাগল না হলে কেউ নির্দয় মহানগর আর ততোধিক নিষ্ঠুর আত্মীয়-পরিজনের গঞ্জনার ব্যামোয় বাঁধা ফটিকটাকে ওভাবে চিরকালের ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়? পাগল না হলে কেউ অভাগী রতনের কাছ থেকে প্রিয় পোস্টমাস্টারকে দূরে সরিয়ে ফেলে? এর আগে সব লেখক তো জিতিয়ে দিত তার নায়ক নায়িকাকে আর এই পাগলটা কিনা তার বা আমাদের কারো ইচ্ছাকে পাত্তা না দিয়ে এক্কেবারে ন্যাংটো করে দেখায় সত্যটাকে।’

 

আবার অপূর্ব বিস্ময়-বিমুগ্ধ কবি জীবনানন্দকে আপন বিরল বৈশিষ্টসমেত পিয়াস তুলে ধরেন কবিতাপ্রতিম স্বচ্ছন্দ-সহজ-সুন্দর গদ্যে- জীবনানন্দ তাঁর কাছে ‘শুদ্ধতম’, ‘নক্ষত্রপ্রতিম’ কিংবা ‘নির্জনতম’ নন; পিয়াস মজিদের জীবনানন্দ‘জগতের যাবতীয় সুতীর্থে খাপ না খাওয়া এক করুণ মাল্যবান মাত্র’।

এমনি করে এ বইতে পিয়াস মজিদ তার পছন্দের কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে অজান্তেই একাকার হয়ে যান। তাঁর প্রবন্ধে একজন প্রকৃত শিল্পীর হৃৎস্পন্দন শোনা যায়, টের পাওয়া যায়- এতে রয়েছে অন্তরের উত্তাপ। পুরোনো কথার পুনরাবৃত্তি করেন না কখনো। শাণিত, যুক্তিময় অনায়াস শিল্পমাতাল গদ্য ভাষায় তাঁর নির্বাচিত লেখকদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে যেন জন্ম দেন এক নবতর সাহিত্য প্রকরণের। অতঃপর রবীন্দ্রনাথ,জীবনানন্দ, বিনয় মজুমদার অথবা আবদুল মান্নান সৈয়দ,সৈয়দ শামসুল হক, শহীদুল জহির প্রমুখ সাহিত্যিক হিসেবে পিয়াস মজিদের কলমে এক নব তাৎপর্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন এই প্রবন্ধগ্রন্থে।

এই বই পাঠককে লেখক-হৃদয়ের আবেগের তলটুকু দেখাবে, আলো-আঁধারিময় পৃথিবীতে স্পষ্ট করে দেবে বিস্ময়ের সূত্রস্বর, এবং গড়ে তুলবে এক নৈঃশব্দ্যের সেতু- যেখানে কিনা পিয়াস মজিদের মৌনি ও ধ্যানি গদ্যের ভেতরেই আমরা খুঁজে পাবো বাঙ্ময় ব্যপ্তির দিশা।

বইটা আমাদের একটু হলেও ভাবাবে, এ-নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

 করুণ মাল্যবান ও অন্যান্য প্রবন্ধ- পিয়াস মজিদ।। প্রকাশক: শুদ্ধস্বর, ঢাকা।। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১২।। প্রচ্ছদ : শিবু কুমার শীল।। ১২৮ পৃষ্ঠা।। ২০০ টাকা।।
মন্তব্য দিন »

সরস তথ্যের মুদিখানা

বেশিরভাগ বাঙালি পাঠক কলকাতার জোঁড়াসাকো ঠাকুরবাড়ির অদ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথ কিংবা অনবদ্য অবনীন্দ্রনাথের লেখনীর সাথে পরিচিত হলেও, সেই বাড়িরই আরেক প্রতিভাবান সাহিত্যিক ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম তাঁদের কাছে অবশ্য অনেকটা অপরিচিতই বৈকি ।  কোনো চরিতাভিধান বা কোষগ্রন্থের ভেতরেও তাঁর নাম খুব সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই তাঁরই রচিত গদ্যগ্রন্থ ‘মুদীর দোকান’ নিয়ে লিখবার আগে বইপড়ুয়াদের কাছে ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের খানিকটা পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি।

মুদীর দোকান-ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথের থেকে বয়সে নয় বছরের ছোট ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৭০ সালে। তাঁর পিতা রবীন্দ্রনাথের বড় দাদা হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঋতেন্দ্রনাথের আগ্রহের জগৎ ছিল বিচিত্র। সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ছিলো। একদিকে তিনি যেমন আসবাব পত্র পালিশ করার নিয়ম নিয়ে লিখেছেন তেমনই অন্যদিকে খাদ্যদ্রব্য, দেব-দেবীর বাহনসহ বিচিত্র বিষয়েও নিবন্ধ লিখেছেন। নাট্যাভিনয় ছিল তাঁর নেশা, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় রবীন্দ্রনাথের সাথে অভিনয় করেছিলেন। ‘কালমৃগয়া’য় অভিনয় করেছিলেন অন্ধমুনির ভূমিকায়। কবিখ্যাতিও ছিল তাঁর; ‘সপ্তস্বরা’ ও ‘পদ্মরাগ’ নামে দুটি কবিতার বইও বেরিয়েছিল। খুড়তুতো ভাই বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলি সংগ্রহ ও সম্পাদনা তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। তিন বছরের জন্য ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত ‘পুণ্য’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৩৬ সালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুবরণ করেন।
‘মুদীর দোকান’ বইটি সাহিত্যরসিক ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকটি সরস রচনার সংকলন। এর প্রথম সংস্করণ বের হয়  এক শ বছরেরও আগে, ১৯০৯ সালে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, তখনই বইটি বিষয়বৈচিত্র্যে ও লেখার মানে-গুণে পাঠকের দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলো। পরে ১৯৩৭ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। প্রায় বাহাত্তর বছর অপ্রকাশিত থাকার পর ২০০৮ সালে কলকাতার চর্চাপদ প্রকাশন থেকে বের হলো এর তৃতীয় সংস্করণ। আগের দুটি সংস্করণের বারোটি নিবন্ধ ছাড়াও ‘পুণ্য’ পত্রিকায় ১৩০৭ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘পালিশ’ ও ‘জগন্নাথ তীর্থে গুরু নানক ও জগন্নাথের আরতি’ শীর্ষক ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা দুটি রচনা উদ্ধার করে এই সংস্করণে সংযোজন করা হয়েছে। বইটির এই নতুন সংস্করণে সংক্ষিত অথচ বেশ সুলিখিত  ও প্রাসঙ্গিক ভূমিকা লিখেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক প্রতাপকুমার রায়। পাঠকের কাছে বইটি সহজবোধ্য করে তুলবার জন্য ভূমিকাটি সহায়ক হবে।
‘মুদীর দোকান’-এর রচনাগুলোর অভিনবত্ব হলো বিষয় নিবার্চনে ও লেখার স্বতন্ত্র ধরনে। প্রধানত এসব রচনায় খাদ্য  এবং কয়েকটি খাবার পদ নিয়ে আলোচনা করা হলেও এতে আরও নানা বিষয়ের লেখা পাওয়া যাবে। মুদিখানায় যা যা লভ্য সেসব তো বটেই, ‘আইবুড়ভাত ও বউভাত’, ‘দেবনামে অনাদর’, ‘প্রাচীন ভারতের উপমাস্থল গরু’ এ ধরনের বিষয়ের নিবন্ধও এ বইটিতে রয়েছে।

ঋতেন্দ্রনাথ নিজে ছিলেন একজন গবেষণামনস্ক লেখক । তাই ‘মুদীর দোকান’-এর প্রত্যেকটি রচনায় কমবেশি গবেষণার ছাপ পাওয়া যায়। এ বইয়ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় ওরিয়েন্টাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ রাজেন্দ্রচন্দ্র শাস্ত্রী লিখেছেন, সুপণ্ডিত ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অধ্যয়নের ক্ষেত্র ছিলো বিস্তৃত এবং তাঁর ভারতীয় দর্শনে জ্ঞান ছিল অগাধ। তিনি যখন যে বিষয়ে লিখেছেন সেই বিষয়ের ওপর যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে পাঠককে জানিয়েছেন। তাই ‘মুদীর দোকান’ বইটিতে তথ্যের প্রাচুর্য লক্ষ করা যায়। সেইসঙ্গে তথ্যগুলো বেশ কৌতুহলোদ্দীপক, অশ্রুতপূর্ব  ও মজাদার। যেমন : আমরা বাঙালি মাত্রেই প্রতিদিন দুবেলা ভাত খাই কিন্তু ‘চাল’ শব্দটি কিভাবে এসেছে তা কি ভেবে দেখি? আমরা না ভাবলেও, লেখক ‘চাল’ নিবন্ধে জানাচ্ছেন যে, সংস্কৃত ‘চাল’ ধাতু যদিও ‘চাল’ শব্দের মূলে কিন্তু চাল শব্দটি বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পত্তি। ‘চাল’ শব্দের আসলে উৎপত্তি হয়েছে  ‘চালন’ বা ‘চেলে নেওয়া’ শব্দ থেকে(পৃষ্ঠা ৩৪)। কুমিল্লা জেলায় একসময় বেশ কমলা ফলতো বলে তিনি মনে করেন, কুমিল্লা থেকেই কমলা নামটি এসেছে (‘কমলানেবু’/ পৃষ্ঠা ১১৪)। ‘বউভাত’ লোকাচারের লেখককৃত আদিরূপের বর্ণনায় এ বইয়ের সবচেয়ে কৌতূহল উদ্রেককারী ও মজার তথ্য মেলে। ‘নববধূর ছোঁয়া অন্ন বরের আত্মীয়স্বজন কর্তৃক গ্রহণের আচারবিশেষ’ হলো বউভাত, আমরা এমন তথ্য  অভিধানে পাই এবং তা ঠিক বলেই মনে করি। কিন্তু ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈদিক শ্লোক-সূত্র ঘেঁটে এ আচারের আদিকথা তুলে ধরে অভিধানে দেওয়া অর্থের সম্পূর্ণ উল্টো তথ্য দেন। বৈদিকযুগে বউভাত আচারটি ছিল এইরকম : বিয়ের তৃতীয় দিনে বর নিজহাতে ‘ভক্ত’ অর্থাৎ ভাত রান্না করে খেতেন এবং অবশিষ্টাংশ ঐ দিন সবর্প্রথম বধূকে খাওয়াতেন। লেখক অনুমান করেছেন, বর বধূকে ভরণপোষণ বা খাদ্যদানে সমর্থ কিনা এটি যেন তারই পরীক্ষা (‘আইবুড়ভাত ও বউভাত’/পৃষ্ঠা ৪৪)।

বইখানা পড়ে একটা যাপার আমরা বেশ স্পষ্ট করে বুঝতে পারি—লেখক অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ভারতীয় উপমহাদেশ এককালে বহু বিষয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল। পাশ্চাত্য যে বস্তুর নাম হতে আরম্ভ করে আহাররীতি ও আচরণের অনেকটাই ভারতীয় সভ্যতা থেকে ধার করেছিল সে বিষয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ ছিল না। নিজের মত প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি যেসব যুক্তি দেখিয়েছেন সেসব অকাট্য না হলেও পাঠকের কাছে অবশ্যই নতুন মনে হবে। যেমন ‘তামাক ও ধূমপান’ রচনায় তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, তামাকের ব্যবহার প্রথম ভারতবর্ষেই শুরু হয়েছিল, আমেরিকায় নয়। এমনকি ইংরেজি ‘সিগার'(Cigar) শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ঈষীকা’ শব্দ হতে(পৃষ্ঠা ১৩৮)। ইংরেজি  Bread শব্দটি যে  সংস্কৃত ‘ভ্রাষ্ট্র’ শব্দের অপভ্রংশ লেখক তাও অত্যন্ত আগ্রহের সাথে দেখান(‘লুচিতরকারী/পৃষ্ঠা ১২০)। লেখক আরো জানান সংস্কৃত ‘নাগরঙ্গ’ হতে ‘নারঙ্গ’ ও ‘নারাঞ্জ’  এবং পরে ‘ন’ লোপ পেয়ে ইংরেজী ‘অরেঞ্জ'(Orange)  শব্দের সৃষ্টি হয়েছে (‘কমলানেবু’/ পৃষ্ঠা ৭৫)।
লেখকের বৈঠকি মেজাজ ও সরস ভঙ্গি ‘মুদীর দোকান’-কে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। এ কারণে বইটি সাধুভাষায় লেখা হলেও তা মোটেও গুরুগম্ভীর নয়। বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিসহ লোকাচারসংশ্লিষ্ট নানারকম অজানা তথ্য জানতে ও এক’শ বছর আগের বাংলা রচনাসাহিত্যের স্বাদ নিতে বইটি অবশ্যপাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মুদীর দোকান- ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর

5 মন্তব্য »

অমীমাংসিত মীমাংসার খোঁজে

মূলত কথাসাহিত্যিক হলেও আহমাদ মোস্তফা কামাল (জন্ম ১৯৬৯) প্রাবন্ধিক হিসেবে ইতিমধ্যেই বিদগ্ধ পাঠককুলের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর প্রথম প্রবন্ধ সংকলন সংশয়ীদের ঈশ্বর (২০০৬) প্রকাশ হবার পরপরই যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিলো ও সমালোচকদের কাছে সমাদরও পেয়েছিল। সম্প্রতি (২০১০) প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধ সংকলন শিল্পের শক্তি শিল্পীর দায়। আগের বইটির মতো এটিও দুটি পর্বে বিভক্ত, প্রত্যেক পর্বে তিনটি তিনটি করে মোট ছয়টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে।

১

বইয়ের একদম শুরুতেই লেখক বলেছেন যে, এইসব প্রবন্ধের সৃষ্টি হয়েছে মূলত প্রশ্ন হতে। তাঁর মনে প্রায়শই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অথবা রাজনীতির মতো আপাত “মীমাংসিত’ বিষয় নিয়ে নানান প্রশ্নের জন্ম হয়,ফলে সেসব “মীমাংসিত’ বিষয় আর মীমাংসিত থাকে না তা নিতান্তই অমীমাংসিত হয়ে যায়। তখন তিনি নিজস্ব সংলাপের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে একটি মীমাংসা বা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তিনি হয়তো মীমাংসার খোঁজ পাননা, কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তও দৃষ্ট হয়না। তাও তিনি প্রশ্নগুলোকে নিয়ে ভাবতে চান এবং সেই ভাবনাগুলো অন্যদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য এক প্রকারের তাড়না অনুভব করেন। আর সেই তাড়না হতেই এ বই তৈরি হয়েছে। আমরা বলতে পারি, এসব বিষয় সম্বন্ধে পাঠকের মনে নতুন ভাবনার উদ্রেক ঘটিয়ে তাঁর মনে কিছু আনকোরা প্রশ্নের জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বইটি রচনা করা হয়েছে।

বইটির প্রথম পর্বের উপশিরোনাম “শিল্প ও শিল্পী সম্পর্কে কিছু বোঝাপড়া’। এ পর্বে সন্নিবেশিত প্রবন্ধত্রয়ী শিল্পী-শিল্প-সাহিত্য ইত্যাকার বিষয়কে ঘিরে আবৃত।

এ পর্বের প্রথম প্রবন্ধ “জনপ্রিয় সাহিত্য,জনপ্রিয়তার সাহিত্য” লেখক এ দীর্ঘ প্রবন্ধে সরাসরি তুলোধুনো করা কিংবা নির্দ্বিধায় মাথায় তোলার আবেগতাড়িত বিচারের বাইরে গিয়ে বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে প্রয়াসী। সেকালের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হতে একালের আনিসুল হক পর্যন্ত প্রায় সকল উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় লেখকদের স্বরূপ, চারিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের আলোচনা এতে লভ্য। লেখক প্রথমে মূলধারা ও জনপ্রিয় ধারার সাহিত্য/সাহিত্যিকদের সংজ্ঞায়নের চেষ্টা করেছেন। তারপর তিনি মূলধারার শিল্পস্রষ্টারা (যেমন, হুমায়ূন আহমেদ বা ইমদাদুল হক মিলন) কেন জনপ্রিয়তার মরীচিকায় হারিয়ে যান তার একটি অন্তরঙ্গ ব্যাখা দেন। আমরা লক্ষ করি,নিজেকে শিল্পিত করা অথবা শিল্পের দায় মেটানোর ব্যাপারে যেসব লেখক নির্লিপ্ত এবং অনুৎসুক লেখাটিতে তাঁদের প্রতি কামাল কখনো প্রচ্ছন্ন, কখনো সরাসরি বিদ্রূপ করতেও ছাড়েননি। উদ্ভট,অমার্জিত ও বস্তাপচা সস্তা বিনোদনমূলক শিল্পসাহিত্যের ডামাডোলের মধ্যে কালোত্তীর্ণ, বিমূর্ত কিংবা চিরন্তনতার মূল্যে শিল্পিত সাহিত্য যে ক্রমশ হারিয়েই যেতে বসেছে, এ জন্য লেখকের যে আফসোস বা মনঃপীড়া সেটাই আসলে গোটা প্রবন্ধের মূল সুর হয়ে বাজে। আমাদের জানামতে বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের অন্দর-বাহির পুরোটাই এখানে প্রথমবারের মতো যথাযথ ও অকপটভাবে আলোচিত, তাই প্রবন্ধটিকে জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যের পয়লা তর্ক-তদন্ত বললেও আশা করি অত্যুক্তি হবে না।

“সমালোচনা,সমালোচক ও পাঠক” প্রবন্ধের ভেতর হাসান আজিজুল হকের বহুল আলোচিত-বিতর্কিত রচনা “সাহিত্য সমালোচনা কীভাবে সম্ভব?’ পাঠের ছাপ ও প্রতিক্রিয়া আছে বলে মনে হয়। কিন্তু এটি আদতে শিল্প-সাহিত্য সমালোচনা,সমালোচক আর সাহিত্য পাঠকের বিষয়ে আহমাদ মোস্তফা কামালের একটি নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত গভীর পর্যবেক্ষণ-পর্যালোচনা বিশেষ। এ গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে লেখক সাহিত্য সমালোচনার প্রকার, নেতিবাচক সমালোচনার দোষত্রুটি, লেখক-সমালোচক-পাঠকের মিথস্ক্রিয়া বা ভাবনা-উপলদ্ধি,সমালোচকের ঠিকুজি-কুলজি, সমালোচনার প্রযোজনীয়তা এইসকল বিষয়-আশয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। কামাল তাঁর লেখার শুরুতেই “কিচ্ছু হয়নি’ বলে যেকোন শিল্প-সাহিত্যকে অনায়াসে বাতিল করে দেবার বহুদিনের প্রথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাঁর মত এই,শুধু বর্জন কিংবা গ্রহণ দিয়ে একজন সমালোচকের শিল্পবোধ প্রকাশ পায়না। শিল্পভোক্তা বা পাঠককে শিল্পের মূল রসসৌন্দর্য উপভোগে সহায়তা করাই হল সমালোচকের আসল দায়িত্ব। আবার একেক জন পাঠকই তো স্বয়ং একেক জন সমালোচক তাদের মূল বই পড়ার আনন্দ কোনো সমালোচকের মুখাপেক্ষী নয়। তাই বলে লেখক এখানে সমালোচনার প্রয়োজনীয়তাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। সৌখিন সমালোচকদের দাপট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচকদের দুরবস্থার জন্য সমালোচনা সাহিত্যের ইদানীংকালের যে বিশৃঙ্খল অবস্থা সেজন্যেও তিনি উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তবে পরিশেষে লেখক আবার পাঠককেই স্বীকৃতি দেন যুগে যুগে সাহিত্য-শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে। সাহিত্যের সৃষ্টি, বিকাশ এবং তার রস উপভোগের ব্যাপারে সমালোচনার ভূমিকা প্রধান নয়, তা নিতান্তই পাঠ-সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—-এ-ই হল উক্ত প্রবন্ধের কথাসার।

সংশয়ীদের ঈশ্বর গ্রন্থের “ধ্যানের জগৎ জ্ঞানের জগৎ” প্রবন্ধে কামাল একজন মানুষ কেন লেখে সেই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করেছিলেন। এবার তিনি আলোচ্য বইয়ের নাম প্রবন্ধ “শিল্পের শক্তি, শিল্পীর দায়”-এ একজন পাঠক কেন পড়েন, একজন শ্রোতা কেন গান শোনেন বা মোদ্দা কথায় কোনো ব্যক্তিবিশেষ ঠিক কী কারণে শিল্প উপভোগ করেন সে প্রশ্নেরই জবাব খুঁজেছেন। তবে নেহাতই এর জবাব খোঁজাই লেখকের একমাত্র উদ্দেশ্য নয় সংশ্লিষ্ট জিজ্ঞাসার উত্তরসমূহ বিশ্লেষণ করে শিল্প ও শিল্পীর দায়-দায়িত্ব, শক্তি-সামর্থ্য এবং শিল্প-সাহিত্যের প্রায়োগিক কার্যকারিতা সম্পর্কে কিছু মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা করাই তাঁর মূল লক্ষ। লেখক এখানে প্রচলিত (লেখকের ভাষায় “চরমপন্থি’) “শিল্পের জন্য শিল্প’ আর “জীবনের জন্য শিল্প’ এই দুই মতবাদের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে উপরোক্ত বিষয়-আশয় আলোচনা করতে চেয়েছেন। তাঁর মতে শিল্প হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে একজন মানুষের চিন্তা-চেতনা,মনোজগতকে পাল্টে দিতে পারে, ব্যক্তিকে সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। জীবনসত্যের মুখোমুখি করে একরকম আশ্রয় বা বেঁচে থাকার প্রণালী পাল্টে দিতে পারে, কিন্তু তা সমাজকে সেভাবে পাল্টাতে কখনোই পারে না। তবে তিনি এ কথাও বলতে ভোলেননি যে, শিল্পই প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তরে সমাজকে গড়ে তোলে বা পাল্টায় ধীরে ধীরে,পরোক্ষভাবে। যদি শিল্পই না থাকতো তাহলে তো আদিম মনুষ্যসমাজ তো সভ্যই হতো না। তাই তাঁর ফয়সালা এই, শিল্পের দায় ও বাহ্যিক মানবীয় প্রয়োজনের দায়—- এই দুয়ের সমন্বয় ঘটান যারা তাঁরাই মহান শিল্পী। এ ছাড়া যেসব শিল্পী সব সামাজিক দায় ভুলে শুধু দেশকাল-নিরপেক্ষ শিল্পসৃষ্টিতে মগ্ন তাঁরাও মহান। সমকালে প্রয়োজন না হোক, ভবিষ্যতের মানুষেরা তাঁদের মনের গড়ন অবশ্যই দেবেন তাঁদের শিল্প হতেই। অবশ্য তিনি একইসঙ্গে এও স্মরণ করিয়ে দেন, শিল্পীর মূল দায় হল শিল্পকে যতটা সম্ভব শিল্প করে তোলা, এটা যত বেশি হবে মানবজাতিরও ততই উপকার হবে। এই প্রবন্ধে শিল্পের প্রয়োজনীয়তা,দায়ভার এবং চিরন্তনতার একটি সুসংহত মূল্যায়ন পাওয়া যায়।

আলোচ্য বইয়ের দ্বিতীয় পর্বের উপশিরোনাম হল “বাংলাদেশঃ সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি”। এ পর্বের প্রবন্ধ তিনটিতে যথাক্রমে বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয়ে প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে নতুনভাবে আলোকপাত করে ভিন্ন ব্যাখা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে।

“রাজনীতির দর্শন ও কর্মসূচি” শিরোনামের সুদীর্ঘ রচনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ,দর্শন এবং কর্মসূচি নিয়ে চুলচেরা আলোচনা করা হয়েছে। লেখক এখানে রাজনৈতিক দলসমূহের দর্শন, ক্ষমতাকালীন কর্মকাণ্ড, আন্দোলন, কৌশল ইত্যাদি বিষয় বিশ্বস্ততার সঙ্গে খতিয়ে দেখতে ইচ্ছুক। এক্ষেত্রে তিনি দল-মত ও নিন্দা-প্রশংসার উর্ধ্বে থেকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক দিকের একটি ভাষ্য রচনা করতে চেয়েছেন। এ কাজটি বেশ দুরূহ এবং কষ্টসাধ্য হওয়া সত্ত্বেও তা অবশেষে সম্পন্ন করতে পেরেছেন—- যা বেশ প্রশংসার দাবি-ই রাখে।

এর পরের প্রবন্ধ “বাঙালির সংস্কৃতিচিন্তা” কয়েকজন সংস্কৃতি তাত্ত্বিকের রচনার সাহায্য নিয়ে সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে একটি সম্যক ও গ্রহণযোগ্য ধারণা নির্মাণের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। তবে আরো কিছু তথ্য ও পূর্ববর্তী দূয়েকজন গবেষকের বিশ্লেষণ নিয়ে আলোচনা থাকলে রচনাটি হয়তো আরকটু পূর্ণতা পেতে পারতো।

গ্রন্থের সর্বশেষ প্রবন্ধ “ইতিহাসের বিকৃতি, ইতিহাসের কারচুপি”-র শিরোনাম পড়ে মনে হতে পারে এখানে বুঝি সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে ইতিহাসের বিকৃতি নিয়ে যে কথা হচ্ছে সে বিষয়ে আলোচনা কার হয়েছে। কিন্তু সেই মোতাবেক রচনাটিতে ইতিহাসের বিকৃতি-কারচুপি নিয়ে বিশ্লেষণের অবকাশ থাকলেও লেখক পরে আর সেদিকে যাননি। এ জন্যই বইটির অন্যসব সূক্ষ্ম লেখার পাশে প্রবন্ধটিকে তুলনামূলকভাবে ম্লান লাগে। তাই পরে তাঁর কাছ থেকে এ বিষয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ প্রত্যাশা করছি, আশা করি তা তিনি লিখে উঠতে পারবেন।

এই প্রবন্ধগুচ্ছ হতে আমরা কী পেলাম-কী না পেলাম সেই কূটতর্কে না যাওয়াই ভালো। শুরুতেই বলা হয়েছে প্রত্যেকটি প্রবন্ধে পরিবেশিত ধারণা অমীমাংসিত। লেখক হয়তো “অমীমাংসিত’ মীমাংসা করার চেষ্টা করেছেন মাত্র। অস্বীকার করা যাবে না, তিনি তাৎক্ষণিক যে সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাও চিরস্থায়ী নয় এবং সবাই তাতে একমতও হবেন না। কিন্তু আসল কথা হল, এ বইটি গভীর চিন্তা ও মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে লেখা বলেই পাঠককে ভাবাবে। বইটি থেকে অনেক পাঠকই কিছু-না-কিছু চিন্তার খোরাক পাবেন এবং সেসব তাঁদের নিজস্ব মৌলিক চিন্তার পুঁজি হিসেবেও কাজে আসতে পারে। এছাড়া বইটি আমাদের চিরচেনা আপাত স্থির বিষয়গুলো একটু নতুনভাবে দেখতে ও মূল্যায়ন করতে শেখায় । পাঠকের জন্য এটি অনেক বড় প্রাপ্তি। বলা যায় বইটি আমাদের পুরোনো চিন্তার বদ্ধ ঘরে টাটকা তাজা সুবাতাস নিয়ে আসবে।

প্রবন্ধগুলোর ভাষাতে বেশ একটা সরস আড্ডার মেজাজ ও “ওয়ান টু ওয়ান’ আলাপচারিতার আমেজ রয়েছে, যা পাঠককে শুরু হতে শেষ অব্দি টানবে। লেখক নিজে একজন অধ্যাপক হলেও প্রবন্ধগুলোর বিষয়ভাবনা কিংবা বক্তব্য প্রকাশে অধ্যাপকসুলভ গাম্ভীর্য ও পাণ্ডিত্য ফলানোর চেষ্টা করেননি। শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়ানো তাঁর প্রবন্ধের গঠন অনেক গোছানো, শৈলী মার্জিত এবং বিশ্লেষণ বস্তুনিষ্ঠ। এসবকিছু মিলিয়ে বইটি সুখপাঠ্য ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

ইদানীং প্রায়শ এমন অভিযোগ শোনা যায় যে, বাঙালি তরুণ লেখকদের মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটছে অর্থাৎ তারা মৌলিকভাবে চিন্তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং যুক্তিতর্কনির্ভর জ্ঞানচর্চায় দক্ষতা দেখাতে পারছে না। লেখক তাঁর এ বইয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন তরুণ লেখকদের সবার বেলায়ই উক্ত অভিযোগ খাটে না। বর্তমানে আমাদের প্রবন্ধসাহিত্যে চিন্তার দারিদ্র্য, দীনতা ও আকালের মধ্যেও আহমাদ মোস্তফা কামাল শিল্পের শক্তি,শিল্পীর দায়-বইতে এক ব্যতিক্রমী ও গভীর মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। এ জন্যে তাঁকে অভিবাদন।

শিল্পের শক্তি,শিল্পীর দায়-আহমাদ মোস্তফা কামাল।। প্রকাশক :  অ্যাডর্ন পাবলিকেশন,ঢাকা।। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারী ২০১০।।প্রচ্ছদঃ সাইম রানা । ১০৪ পৃষ্ঠা। মূল্য : ১৭০ টাকা।

মন্তব্য দিন »

ভীষণরকম অন্তর্ঘাতের অপরূপ গল্পগুলো : হাসান মাহবুবের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত’

‘‘হাঙরের ঢেউয়ে ক্ষতবিক্ষত’’— একদা জ্যাঁ আর্তুর র‍্যাঁবোর কবিতার চৈতন্যকে এভাবে বাক্যবন্দী করেছিলেন লেখক হেনরি মিলার । আমি হাসান মাহবুবের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত‘-কেও সেরকম রক্তাক্ত বই-ই বলতে চাইবো।

মিল-অমিলের প্রশ্নকে দূরে সরিয়ে দিলেও, কাল্পনিক স্বর্গের লোভ আর স্বনির্মিত নরকের যন্ত্রণার এমন সহাবস্থান, আগে একদম দেখি নি এমনটি নয়, তবে বাংলা কথাসাহিত্যে এইরকম ধাঁচের গল্প স্বল্পই নজরে পড়েছে আমার। চারপাশের অসামাঞ্জস্যগুলোকে রীতিমতো ফালি ফালি করে দেবার বিস্ময়কর ক্ষমতা হাসান মাহবুবের আছে। পৃষ্ঠা থেকে পৃষ্ঠান্তরে তাঁর গল্পের বুনন কখনো থামে না, বরং তা সাবলীলভাবে এগিয়ে যায় বৃহত্তর মানসিক সংকট ও পারিপার্শ্বিক সংঘটনের দৃশ্যাবলির দিকে।

পাঠক বুঝবেন, গল্পে গল্পে বর্ণিত কথাগুলো একান্তই তাঁর, যা কিনা অবশেষে আমাদের সবার লুকোনো অভাবিত সিদ্ধান্ত ও ভয়ানক গোপন কথকতাকে উন্মোচিত করে ছাড়ে!

যথারীতি, পরাবাস্তবতা হাসান মাহবুবের প্রায় গল্পেই এসেছে। তবে তা কখনো একক আঙ্গিকে নয়; সে পাঠকের সামনে উপস্থিত হয় নানান রূপে, অদ্ভুত ভঙ্গিমায়, অচেনা অবয়বে — যন্ত্রণার আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে এক্কেবারে ‘‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার’’ পরিস্থিতি যেন।

তিনি এমন তীক্ষ্ণধী চিলচোখা এবং ঘোরলাগা অভিযাত্রী বলেই আগাপাশতলা ভাঙচুরপ্রয়াসী কিংবা অপরূপ শাপগ্রস্থের মহিমা বর্ণনা করতে পারেন অনায়াসেই ! বইটি তো আরেকদিকে প্রচলিত গঁৎবঁধা ক্লিশে সমাজবিন্যাস ও ষড়যন্ত্রী চতুর রাজনীতির বিরুদ্ধকামী এক সমুজ্জ্বল প্রত্যাখানের শৈল্পিক দলিলও বৈকি। জীবন-যাপনের অভ্যস্ত ছকে কী ভীষণরকম অন্তর্ঘাত!

পাঠক, পড়ুন কাঠপেন্সিল থেকে প্রকাশিত শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক হাসান মাহবুবের সর্বপ্রথম গল্পগ্রন্থ ‘‘প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত’’—-মোট সতেরোটি দৃপ্ত আর ব্যতিক্রমী গল্প এতে সংকলিত হয়েছে।

প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত-হাসান মাহবুব।। প্রকাশক : কাঠপেন্সিল, ঢাকা।। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী ২০১২ ।। প্রচ্ছদ : গোলাম কিবরিয়া শাহিন ।। মূল্য : ১৭৫ টাকা

2 মন্তব্য »

পিয়াস মজিদের মারবেল ফলের মওসুম : স্বাপ্নিক-বাস্তবতার কবিতা

নর্তকী মরে গেলে জন্ম নেয় নাচের মুকুর…

-পিয়াস মজিদ/মারবেল ফলের মওসুম

মারবেল ফলের মওসুম-পিয়াস মজিদ।। প্রকাশক : শুদ্ধস্বর, ঢাকা।। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী ২০১১ ।। প্রচ্ছদ : শিবু কুমার শীল।। মূল্য : ১০০ টাকা

পিয়াস মজিদের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ মারবেল ফলের মওসুম-এর বিভাব কবিতায় কথিত ঋতুহীন মারবেল ফল স্বপ্নপ্রসূ। আবার সে স্বপ্ন অলীকও নয়। আর তা এজন্যে যে, স্বপ্নও মানুষের জীবনবাস্তবতারই অবচেতন স্বর-যা কিনা একজন প্রকৃত কবির চেতনায় একেবারে জীবন্ত হয়ে ওঠে। জীবনানন্দ দাশ ‘স্বপ্নের হাতে’ ধরা দিয়ে অনুভব করেছিলেন :

‘পৃথিবীর যত ব্যথা-বিরোধ-বাস্তব
হৃদয় ভুলিয়া যায় সব!
চাহিয়াছে অন্তর যে-ভাষা
যেই ইচ্ছা,-যেই ভালবাসা
খুঁজিয়াছি পৃথিবীর পারে পারে গিয়া,
-স্বপ্নে তাহা সত্য হয়ে উঠেছে ফলিয়া!’

আবার তিনি আমাদের স্বপ্নের হাতে ধরা দেবার আহ্বান জানিয়েছিলেন এভাবে :

‘মরমের যত তৃষ্ণা আছে,
তারি খোঁজে ছায়া আর স্বপ্নের কাছে
তোমরা চলিয়া আস,
-তোমরা চলিয়া আস সব।’

বাংলাদেশের সাম্প্রতিকতম কবিতার পাঠকও যেন এই কাব্যগ্রন্থে ওই একই আহ্বান শুনতে পান ‘মরমের তৃষ্ণা’ কাতর এক নবীন কবি পিয়াস মজিদের কাছ থেকে।

বইটির প্রথম কবিতা ‘কবি’-তে পিয়াস নির্মাণ করেন এক কৌতূহলী কবিসত্ত্বাকে, যে-কিনা অক্ষরের বদলে ফুলের স্বর শুনে গন্ধভাষায় জরিপ করে স্বপ্ন-নক্ষত্রের দ্বারা নিহত হওয়া সত্ত্বেও সে মোমের আলোক জ্বালাতে সচেষ্ট শবের উপকূলে। এখানে আমাদের ফের মনে পড়তে পারে জীবনানন্দের কথা-তাঁর লিখে যাওয়া সেই চূর্ণবাদী সমুদ্রে ভাসমান অনুসন্ধানী নাবিক-আত্মার কথা। ঠিক সেভাবেই পিয়াসের এই কবিতাও হয়ে ওঠে সন্ধানী মানবজাতির প্রতীক খোঁজার বয়ান, তমসা-মিনারের চাইতে উঁচু আধাঁর-ঘেঁষা অসম্ভব চুম্বনের নিশানা – ফলত সেখানে ওই কবিসত্ত্বার কাছে যুক্তাক্ষরময় পৃথিবীতে চিরকেলে অনির্ণেয় ‍‌‌‌‍‌‍‌‌‌তুমি সর্বনামই একমাত্র সোজাসাপ্টা ব্যথা হয়ে ধরা দেয়(অবশ্য সেই অধরা অনুভূতিকে শব্দমালার ভেতরে ধরবার কাজ তো কষ্টেরই বৈকি, তবুও সেটা কবি করে যাচ্ছেন ক্রমাগত!)। এরপর আমরা দেখতে পাবো, মারবেল ফলের মওসুম-এ ‘তুমি’ সর্বনামই বারবার হাজির হচ্ছে-কবিতার পর কবিতার আয়না ভাঙতে ভাঙতে সে আসছে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিমায়, অন্য অবয়বে। নতুন প্রতীকে তার সৃষ্টিও হচ্ছে অন্যরকমভাবে। তুমির দিকে ফিরে ফিরে সেই কবিসত্তার মেধাভস্ম কখনো গিলেটিনে বসন্তবলি হয়, কখনোবা স্রেফ পুড়তেই থাকে:

‘তোমার
পায়ের পথে
একজন;
রোদে পুড়ে
খাক হওয়া
করুণ মল্লার।’(বিধুর/পৃষ্ঠা ২২)

এভাবেই ক্রমে ক্রমে মারবেল ফলের মওসুম-এ সৃষ্টি হয় বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র জগৎ। যেখানে আবেগ-অনুভূতির স্রোতের তোড়ে তৈরি হয় অবিমিশ্র বিষাদের সূক্ষ্ণ পরাবাস্তব শিল্পকলা, ফিনফিনে সুতোর মতোই যার বিস্তার, যাকে পড়তে হয় পলাশ আর শিমুলভাষায়:

‘যখন আমার ভেতর
কিছু সমুদ্রবীথি ও অনন্ত শ্মশান।
শেষ বিকেলের যত ছায়াছন্দ
জলের অতলে যেতে
থেমে যায় মৎস্যসরণিতে।
আমাকে বধির করে
বাগিচায় জন্ম নেয়
সহস্র শিমুল আর
পলাশভাষা।’(‘শিল্পকলা’/পৃষ্ঠা ১২)

বস্তুত, কবির এই নিজস্ব পৃথিবীতে অবগাহনের শব্দই এখানে তৈরি করে অন্যরকম ভাবনা, কবির সেইসব ভাবনায় ভ্রমণের উৎসুক্যই প্রসারিত হয়ে চলে গোটা কাব্য জুড়ে। রাত্রির নিদ্রিত ঝরোকায় তিনি জেগে উঠতে চান কোনো সময়, আবার হয়তোবা তলিয়ে যেতে চান কালো গোলাপের ঝাপটায়-অপুষ্পক উদ্ভিদের ছায়ায়। কবির এই ভ্রমণে রক্তমাখা হাহাকার ও আঘাতের ভ্রম- দুটোই লভ্য। কিন্তু তাতে অনবদ্য আলোকায়নের তৃপ্তিও কম পান না তিনি :

‘আমি যতই যেতে চাই অন্ধকারের দিকে
চারদিকে ততই তারাদের আজন্ম প্রহরা।
আর কে যেন সন্ধ্যার শান্ত গান ছেনে
শিল্পহারা পিয়াসের জন্যে তুলে রাখে
রক্তিম রাগমালা।
আমি; বাস্তব ও স্বপ্নে মার খাওয়া মানুষ
ওই প্রভা এবং সুরশক্তির পায়ে
উপচার হিসেবে ঢলের মতো
ঢেলে দিতে পারি
আমার
একবিন্দু
অশ্রুকুমকুম।’(‘পারমিতা’/ পৃষ্ঠা ৩০)

তবে মারবেল ফলের মওসুম-কে স্রেফ পরাবাস্তবতা আর কল্পনার কাব্য বলাটা ভুল হবে। পরাবাস্তবতার ভেতরেও যে ব্যক্তিগত বিষাদ বা দৈনন্দিন হতাশা পরতে পরতে জমে থাকে; সেটাকেও পিয়াস খুব সহজাতভাবে প্রকাশ করেন তাঁর কবিতায়। আমাদের সময়ের অন্তর্গত নাগরিক শোক-বাসনা-ব্যসন এবং রাজনৈতিক ক্রোধ-বিক্ষোভও এখানে চলে আসে, সোজাসাপটা কাব্যিক ভঙ্গিমায় :

‘একদিন ওয়ান ইলেভেন।
আরেকদিন
চাকমা বান্ধবীর গোপান বিষাদ।
সকালে কালো কফি।
সারারাত জৈবিক ভূগোল
জাগরণে বিভাবরী
পায়ে ভূমিহীনতা।’ (‘জীবনযাপন’/ পৃষ্ঠা ৪৮)

আবার আদ্যের গম্ভীরা গানে যেভাবে মহাদেবের ওপর পৃথিবীর যাবতীয় অসংগতি নিয়ে বিদ্রূপ-বাণ ছেড়ে দিত গাইয়েরা – ‘গম্ভীরা ২০১০’ কবিতায় সেই ঐতিহ্যের মতো করেই, ধারালো ভঙ্গিতে পিয়াস যেন যান্ত্রিক সভ্যতার সমস্ত মানবিক-সজীব অনুভূতিকে গ্রাস করার অসুস্থ প্রবণতাকে খানিকটা অপদস্ত করে ছাড়েন :

‘আর তুমি
পেনড্রাইভে
ভরে ফেলছ
এমনকি
সন্ধ্যার
সমস্ত
মাধুরী।’(পৃষ্ঠা ৩৯)

লক্ষণীয়, পিয়াস মজিদের এই কাব্যগ্রন্থে অনেক সময় এভাবে বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির সংশ্লেষের সাথে একই সমতলে মিশে গিয়েছে বৈশ্বিক অন্তর্জালের সংকেতধর্মী ঠিকানা। তাই বলে তা দুর্বোধ্য নয়। পিয়াস মজিদের কাব্যভাষা এখানেই গতানুগতিকের মোড়ক ছেড়ে এক ব্যতিক্রমী রূপ নেয়। তিনি বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হন-তাঁর কবিতা অন্যধাঁচের, তাঁর অনুভূতির ডানা ভিন্ন গড়নের :

‘পায় না সবাই প্রেতসংকেত। ওরা
যত পরিলিপ্ত। আমি মায়ের জঠর
থেকে সরাসরি ক্ষুধার ভেলায় চড়ে,
অরূপের রেখা ধরে এসেছি এই
দাবদাহকূলে। ওগো অস্তমিত প্রেম,
শোনো- দক্ষিণে জখমি ঝরনার
গান, চুম্বনঝরোকার রেশমি বিলাপ।
তোমার প্রবেশ তোরণ ঘুমিয়ে গেলে
আমি মরবো কোথায়?’(হিন্দোল/পৃষ্ঠা ৪৩)

প্রেম সরাসরি পিয়াসের কবিতায় আসে না সবসময়, সেও ইঙ্গিতে ধরা দেয়। যেখানে তিনি কারো অসম্ভব কালো নূপুর কিংবা আসন্ন ভোরে রূপান্তরিত হন। অতঃপর প্রেম প্রসঙ্গে কবির অভিজ্ঞান দাঁড়ায় এই:

‘তুমি
শুনতে শুনতে
মলিন হওয়া গান।

আমি
এক জনমের
মঞ্চক্লান্ত
নীল নটরাজ।

আসলে জানকী শুষে নেয়
তারাহারা দিগন্তের
গাঢ় অভিসার।’(‘অভিজ্ঞান’/পৃষ্ঠা ৪৪)

গ্রন্থের শেষ কবিতাটির শিরোনাম ‘গ্রীনরোডে’। কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ স্মরণে লেখা বলেই হয়তো কবিতাটি তাৎপর্যের দিক হতে একটু বেশিই মূল্যায়ন দাবী করে আমাদের কাছ থেকে:

‘স্মৃতি থেকে আমি দিব্যি মনে করতে পারি

অমরতার জন্যে একমাত্র মৃত্যুই

আশ্রয় নিয়েছিল তার নিঃসঙ্গ কাননে।’(পৃষ্ঠা ৫৫)

এক্ষেত্রে বলতে পারি, পিয়াস মজিদের কবিতাও এই অমর মৃত্যুর কাননের সাথে পরিচিত। যেখানে দ্রোহ বারবার আহত হয়, হৃদয় হয় ছুরিচিকিৎসার শিকার, বোধ দিয়ে ঝরে রক্ত-কিন্তু সেখানে কবিতার মৃত্যু হয় না। পিয়াসের কবিতা সেই কাননের বাসিন্দা হয়ে সমকালকে জড়িয়ে ধরে সাবলীলভাবে ক্রমশ মহাকালের পথে এগোতে থাকে ।

এই কবিতার বইয়ে তেমনভাবে কোনো ছন্দের ব্যবহার নজরে পড়বে না পাঠকের। কবি হয়তো ইচ্ছা করেই এখানে ছন্দের প্রথাগত গণ্ডীতে বাঁধেননি কবিতাগুলোকে। তা সত্ত্বেও নিবিড় পাঠের মাধ্যমে বোঝা যায়, পিয়াসের কবিতার ভেতর একটা অন্তর্গত ছন্দ আছে- অর্কেস্ট্রা বা রাগসংগীতের অনায়াস চলনের মেজাজ যেন। তা অতি সূক্ষ্ণ বুননের মতোই কবিতার ভেতর নিবিড়ভাবে লুকিয়ে থাকে।

পিয়াস মজিদের কবিতায় পাঠক হয়তো কোনো নির্দিষ্ট চিত্রকল্প বা সীমাবদ্ধ দৃশ্য খুঁজে পাবেন না। তবে সেখানে মিলবে এক অন্যরকম ধ্যানী কাব্যভাষা, যেখানে বাঁধাধরা রূপকল্পে নয় বরং সংগীতের সুরের মতো তাঁর অন্তর্গত বোধ কবিতা-পাঠকের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। কবি এক্ষেত্রে খানিকটা স্বল্পবাকই, মৌনী – হট্টগোলের ভেতর ক্রমাগত চুরমার হতে থাকা পৃথিবীকে তিনি দেখেন নৈঃশব্দ্যের আড়াল দিয়ে। প্রচলিত প্রক্রিয়ায় শব্দকে অতিরিক্ত ও অতি রিক্ত-ভাবে ব্যবহার করবার বদলে নৈঃশব্দ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রত্নভাষাকে রচনা করে চলেন সযত্নে-সুতীক্ষ্ণভাবে । নৈঃশব্দ্যের মধ্য দিয়ে রহস্যের পাঠোদ্ধারেও তাঁর দক্ষতা নজর কাড়বার মতো। মালার্মে বলেছিলেন একটি বস্তুকে নির্বাচন করে তার ভেতর থেকে একটি মুডকে খুঁজে নিয়ে তা থেকে স্বতন্ত্র কোনো সংকেত উদ্ধার করবার কথা। সেই প্রচেষ্টাও পিয়াস চালিয়েছেন এ কাব্যগ্রন্থে, অত্যন্ত দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতার সাথে। স্বল্প শব্দের হলেও তাঁর কবিতার আমেজ ও প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। উদাহরণ হিসেবে ‘সুরভি’ কবিতাটির কথাই ধরা যাক :

‘আমার
মৃত্যুমুহূর্তের
উপর
কে
যেন
জাফরান
ছিটিয়ে
যায়।’(পৃষ্ঠা ৩২)

এখানে কবিতাটির শরীর তেমন দীর্ঘকায় না হলেও অল্প শব্দেই কবির দক্ষতা ও অন্যরকম শৈলী প্রয়োগের জোরে একটা চিরস্থায়ী রেশ রেখে যায়। যা অনেকটা সেই জাফরানের সুগন্ধের মতোই প্রচণ্ড উপভোগ্য এবং সে বিধ্বস্ত ঘ্রাণ আমাদের চেতনার মর্মমূলে গিয়ে নাড়া দেয় । আবার ‘দৃশ্য’ কবিতাটি এক ধরণের সময়-বলয় তৈরি করে ফেলে স্বল্প অক্ষরেই :

‘একটা নদী আমাকে দ্বিধাবিভক্ত করে
তিনটা শেয়াল সেটা দেখে
এবং
ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা।’(পৃষ্ঠা ৩৩)

প্রসঙ্গত বলা চলে, শঙ্খ ঘোষ তাঁর কবিতায় যখন লিখে চলেছেন চুপ করার ও শব্দহীন হবার কথা, তখন অনেকে আপত্তি করলেও সেই হিরণ্ময় পঙক্তিগুলোর ভেতরেই একজন সতীর্থ দেখতে পেয়েছিলেন ব্যাপ্তির দিশা- আমাদের মতে ওই একই কথা পিয়াস মজিদের মারবেল ফলের মওসুম-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখানে শব্দের বদলে নৈঃশব্দ্য, অধিক কথার বদলে স্বল্পতার সংকেত পাঠকের অনুভূতির অ্যান্টেনাকে ঘুরিয়ে দেয় নতুন কাব্যঘ্রাণের দিকে, এক অন্য ধরণের স্বাপ্নিক অথচ অনুপেৰণীয় কবিতার জগতের দিকে।

গ্রিক পুরাণে দেবী ভেনাস বিশ্বসংসারের সবকিছুকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন-সব বিপ্রতীপতা সেখানে মিলে গিয়েছিল-সমগ্র মিশে গিয়েছিল অংশে, অংশ সমগ্রে। সমস্তকিছুকে তিনি করে তুলেছিলেন এককের অংশ। ব্যাপারটা মারবেল ফলের মওসুম বইটির ক্ষেত্রেও খাটে। এ কাব্যগ্রন্থে সবকিছুই এককের অংশ, পরস্পরের সাথে এমনভাবে যাবতীয় বিষয়াদি মিশে গিয়েছে যে ফলত সেখানে প্রকৃতপক্ষে একটি কাব্যই রয়েছে। যার ইশারাটা আমরা পেলাম মাত্র । বাকি উহ্য অংশটা ‘অধরা মাধুরী’ হয়ে প্রকাশিত সমগ্রের সাথে একাকার হয়ে আছে। সেটা পাঠক খুঁজে নেবেন অবশেষে, নিজের মতো করে।

মারবেল ফলের মওসুম-পিয়াস মজিদ।। প্রকাশক : শুদ্ধস্বর, ঢাকা।। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী ২০১১ ।। প্রচ্ছদ : শিবু কুমার শীল।। মূল্য : ১০০ টাকা

মাসিক সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমে পূর্বে প্রকাশিত

2 মন্তব্য »